আল্লাহ তা‘আলা এক বিশেষ উদ্দেশ্যে জিন-ইনসান সৃষ্টি করেছেন, তিনি বলেন:
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ﴾
“আমি জিন্-ইনসান সৃষ্টি করেছি এজন্য যে, তারা শুধু আমারই ‘ইবাদত করবে।”[১]
মানুষ সঠিক পথে চলতে চাইলেও প্রকাশ্য শত্রু ইবলিসের ধোঁকায় সেই পথ হতে বিচ্যুত হয়ে যায়। কিন্তু মানুষ যাতে সরল-সঠিক পথে পরিচালিত ও প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে এবং ইবলিসের যাবতীয় আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়, সে জন্য আল্লাহ তা‘আলা যুগে যুগে অসংখ্য নাবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। আর নাবী-রাসূলদের ধারাবাহিকতা সম্পন্ন করেছেন সর্বশ্রেষ্ঠ নাবী ও রাসূল মুহাম্মাদ ইবনু ‘আব্দুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মাধ্যমে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে মহান আদর্শের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন:
﴿وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيْمٍ﴾
“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত।”[২]
নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে বলেন:
إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق.
“উত্তম আদর্শের পরিপূর্ণ রূপ দেয়ার উদ্দেশ্যেই আমি প্রেরিত হয়েছি।”[৩]
যাঁকে আল্লাহ তা‘আলা উত্তম আদর্শের পরিপূর্ণ রূপদানের জন্য প্রেরণ করেছেন এবং মহান আদর্শের ধারক-বাহক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর জীবন-চরিত সম্বন্ধে জ্ঞানার্জনের আবশ্যিকতা নিঃসন্দেহে গুরুত্ববহ। কেননা তাঁকে স্বীকৃতি না দিলে মহান আল্লাহকে স্বীকৃতি দেয়া হয় না এবং তাঁর প্রতি ঈমান না আনলে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা হয় না। এজন্যই ইসলামে প্রবেশ করতে হলে ঘোষণা দিতে হয়
“أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ”.
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন মাবূদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বান্দা ও প্রেরিত রাসূল।”
যাঁর ব্যাপারে সাক্ষ্য না দিলে মহান আল্লাহকে সাক্ষ্য দেয়া হয় না এবং যাঁর প্রতি ঈমান না আনলে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা হয় না, এমন একজন ব্যক্তিত্বের জীবন-চরিত সম্পর্কে অবগত হওয়া কতইনা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়াও প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত অবগত হওয়ার নানাবিধ কারণ ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যা সংক্ষিপ্তভাবে নিম্নে আলোকপাত করা হলো।
প্রথম: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে অনুসরণ করতে হলে তাঁর সীরাত জানা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত বা জীবন-চরিত অবগত হওয়া ছাড়া নিখুঁতভাবে তাঁকে অনুসরণ করা সম্ভব নয়। অথচ তাঁকে অনুসরণ ছাড়া ইসলাম পালনের বিকল্প কোনো পথ নেই, কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে শরঈ ‘ইবাদতের মানদ- করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا﴾
“রাসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকো।”[৪]
তাঁর মাঝেই রয়েছে উত্তম আদর্শ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيْ رَسُوْلِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ﴾
“নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মাঝে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।”[৫]
অতএব রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উত্তম আদর্শ অনুসরণ করতে হলে তাঁর সীরাত বা জীবন-চরিত জানার বিকল্প নেই।
দ্বিতীয়: ইসলামী বিধি-বিধান পালন ও প্রয়োগের শিক্ষা নিতে চাইলে শিক্ষা নিতে হবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সীরাত বা জীবন-চরিত থেকে, কারণ তিনি হলেন ইসলামী বিধি-বিধানের বাস্তব নমুনা বা চিত্র।
তৃতীয়: আল্লাহ তা‘আলার প্রিয়ভাজন হতে চাইলে তাঁর প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর একনিষ্ঠ অনুসারী হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَحِيْمٌ﴾
“বলো: যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও তাহলে একমাত্র আমাকেই অনুসরণ করো। ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের ত্রুটিসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”[৬]
অতএব, মহান আল্লাহর ক্ষমা ও ভালবাসা পেতে হলে তাঁরই প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী হতে হবে। আর তাঁর অনুসারী হতে হলে অবশ্যই তাঁকে চিনতে হবে এবং তাঁর সীরাত বা জীবন-চরিত জানতে হবে।
চতুর্থ: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত জানার মাধ্যমে তাঁর আদর্শে জীবন গড়ার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। অজানা পথে চলা কখনই সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত বা জীবন-চরিত জানার মাধ্যমে তাঁর আদর্শে জীবন গড়ার প্রেরণা তৈরি হয়। সুতরাং তাঁর সীরাত জানা অপরিহার্য।
পঞ্চম: মানুষ বিভিন্ন পেশাজীবী, কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, কেউ ব্যবসায়ী আবার কেউ সেনাপতি, কেউ শাসক সকল পেশাজীবীর আদর্শ ভিন্ন-ভিন্ন হলেও সবকিছুরই সমাবেশ যেনো এক মহান ব্যক্তির আদর্শের মাঝে, আর তিনি হলেন নাবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। অতএব বহুমুখী পেশার আদর্শ জানতে হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত জানা আবশ্যক।
ষষ্ঠ: সকল পরিপূর্ণতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য নির্দিষ্ট। মানুষমাত্রই কিছু না কিছু অপরিপূর্ণতা রয়েছে। তারপরেও মানুষের মাঝে যিনি সর্বপরিপূর্ণ তিনিই হলেন আমাদের প্রিয় নাবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيْمٍ﴾
“নিশ্চয়ই তুমি মহান আদর্শের ধারক-বাহক।”[৭]
অতএব ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সামরিক বা রাষ্ট্রীয় সকল বিষয়ে পূর্ণ পারদর্শী হিসেবে কাউকে পেতে চাইলে, সে মহান আদর্শিক ব্যক্তিটির সীরাত বা জীবনাদর্শ সম্পর্কে জানতে হবে আর তিনি আমাদের প্রিয় নাবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। তিনিই একমাত্র মহান আদর্শের ধারক-বাহক।
সপ্তম: প্রতিটি মুসলিমের কুরআন ও সুন্নাহ ভালভাবে উপলব্ধি করে মেনে চলা উচিত। কুরআন-সুন্নাহ ভালভাবে বুঝতে হলেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত বা জীবনাদর্শ জানার বিকল্প নেই। কারণ কুরআন-সুন্নাহর বাস্তব নমুনা ও দৃষ্টান্ত হলেন নাবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
সা‘ঈদ ইবনু হিশাম মদীনায় এসে উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্ (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহা) এর কাছে কতগুলো মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। সেই সাথে বললেন হে উম্মুল মুমিনীন! আমাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদর্শ সম্পর্কে কিছু বলুন! তখন তিনি বললেন: আপনি কি কুরআন পড়েন না? আমি বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন, নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদর্শ হলো আল কুরআন। [৮]
অতএব কুরআন-সুন্নাহ সঠিকভাবে বুঝতে চাইলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত বা জীবনাদর্শ জানা অপরিহার্য।
অষ্টম: নানাবিধ জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জনের একমাত্র পথ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত জানা। আধুনিক জ্ঞান-গবেষণায় ইসলামী জ্ঞান বহুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। যেমন- ‘আক্বীদার জ্ঞান, তাফসীরের জ্ঞান, হাদীসের জ্ঞান, ফিকহের জ্ঞান, উসুলের জ্ঞান, নাহুর জ্ঞান, সরফের জ্ঞান, আরবী ভাষার জ্ঞান, ইতিহাসের জ্ঞান ইত্যাদি। সকল বিষয় তো দূরের কথা; বরং এক বিষয় জানলে অপর বিষয় অজানা থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে কেউ যদি সকল বিষয়ের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই নাবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাতের জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কারণ সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমষ্টি হলো তাঁর জীবনাদর্শ।
নবম: ইসলাম বিদ্বেষী মহল নানাভাবে ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, এমনকি মহান আদর্শের প্রতীক নাবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলতেও দ্বিধা করে না। এসব সংশয়পূর্ণ অবান্তর কথার বিপরীতে সঠিক ‘আক্বীদাহ্ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে এবং বাতিলের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে রাসূলুল্লাহর সীরাত জানা অপরিহার্য। তাঁর সীরাত জানার মাধ্যমে সঠিক অবস্থানে স্থীর থাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সম্ভব, নচেত সংশয়ে পতিত হওয়া এবং ভ্রান্তিতে জড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
দশম: মানব জীবন নানা প্রেক্ষাপটের সম্মুখীন হয়। সঠিক জ্ঞান, ধারণা ও অভিজ্ঞতা না থাকালে সব প্রেক্ষাপটে সঠিক অবস্থান গ্রহণ সম্ভব হয় না। জীবনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক প্রভৃতি সমস্যা ও সংকটে সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত জানা অপরিহার্য। তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনে বিশেষ করে দা‘ওয়াতী জীবনে নানা প্রেক্ষাপটে যেভাবে ওয়াহীভিত্তিক সমাধান পেয়েছেন, তাঁর সীরাত জানার মাধ্যমে আমরাও সে সমাধান থেকে শিক্ষা নিয়ে উত্তরণের পথ খুঁজে পেতে পারি।
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি আদর্শ জীবন গড়তে, পরিপূর্ণ ইসলাম মেনে চলতে এবং সঠিকভাবে কুরআন-সুন্নাহ বুঝতে ও নির্ভুল জীবন পরিচালনায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত জানা অপরিহার্য। এমনকি ফরযে আইন বললেও ভুল হবে না। কারণ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জানা ও মানা ঈমানের অর্ধাংশ। সুতরাং কম-বেশি যতটুকুই হোক রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে জানতেই হবে।
আমরা অবগত হলাম নানাবিধ কারণ ও প্রয়োজনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত জানা অপরিহার্য। এখন প্রশ্ন আসে আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগ পাইনি, যারা পেয়েছেনÑ সাহাবায়ে কিরাম তাদের যুগও পাইনি। প্রায় চৌদ্দশত বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্বার্থবাদী মহল নিজ প্রয়োজনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নামে বহু বর্ণনার অবতারণা করেছে, এমতাবস্থায় আমরা কোন নির্ভরযোগ্য উৎস হতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত শিক্ষা নিব। জবাবে আমরা বলতে পারি তিন শ্রেণীর মানুষ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জীবনাদর্শ বা সীরাত সংক্রান্ত তথ্যসমূহে কিছুটা ধুম্রজাল সৃষ্টি করেছে যার ফলে অবশ্যই তাদের বিষয়ে সতর্ক হতে হবে এবং নির্ভরযোগ্য উৎস হতে সীরাতুন্নাবীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
যে তিন শ্রেণী অস্বচ্ছতার আশ্রয় নিয়েছে তারা হচ্ছে-
- (১) রাফেযী বা চরমপন্থী শী‘আহ্: তারা মনগড়া মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য অসংখ্য হাদীস ও ঘটনার অবতারণা করে ধুম্রজাল সৃষ্টি করেছে।
- (২) বিদআতপন্থী: যারা বিশুদ্ধ সুন্নাহর উপর গুরুত্ব না দিয়ে সকলপ্রকার বর্ণনা কোন যাচাই-বাছাই ছাড়াই গ্রহণ করেছে ফলে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তত্ত্ব ও তথ্য হতে সীরাত শিক্ষার্থীকে বঞ্চিত করেছে।
- (৩) প্রাচ্যবাদী: পাশ্চাত্যের এমন সব গবেষক, যারা প্রাচ্যের মুসলিম দেশ ও জনগণের মাঝে ইসলাম গবেষণার নামে ধুম্রজাল সৃষ্টির ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তারাও সীরাতের নামে বিভিন্ন গবেষণার আলোকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে কুলষিত করার চেষ্টা করেছে।
এ তিন শ্রেণী হতে সকল সীরাতুন্নাবী শিক্ষার্থীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। সীরাতুন্নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিক্ষার নির্ভরযোগ্য উৎস, যা হতে প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সীরাত বা জীবন-চরিত গ্রহণ করা যায় তা নিম্নরূপ-
- ১. আল কুরআনুল কারীম: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত শিক্ষার সর্বনিখুঁত, নির্ভেজাল এবং ত্রুটিমুক্ত উৎস হলো আল কুরআনুল কারীম। নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মক্কা ও মদীনার জীবনের বিভিন্ন দিক এমনকি নবূওয়াতের পূর্বের অবস্থাও সংক্ষিপ্ত পরিসরে আল কুরআনুল কারীমে আলোকপাত করা হয়েছে। যেমন- সূরা আয্ যুহা-। কুরআনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনাসমূহ নির্ভরযোগ্য তাফসীরের সহযোগিতায় বিস্তারিতভাবে জানা যেতে পারে।
- ২. হাদীস: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বক্তব্য ও কর্মের মাধ্যমে পরিপূর্ণ সীরাত বা জীবনাদর্শ নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। অনেক হাদীস গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত সম্পর্কিত পর্ব রয়েছে, অনুরূপ مناقب ও فضائل এবং مغازى ও سير ইত্যাদি পর্বে জীবন-চরিত আলোচনা করা হয়েছে। যেমন- সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম গ্রন্থে রয়েছে অনুরূপ সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থসমূহেও রয়েছে।
- ৩. শামায়িল গ্রন্থ : যে সমস্ত হাদীস গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আচার-আচরণ, চলাফেরা ও আদর্শ সম্পর্কে বর্ণনা সংকলিত হয়েছে, এসব বর্ণনা পূর্বের গ্রন্থসমূহেও রয়েছে আবার স্বতন্ত্র গ্রন্থেও রয়েছে, যেমন- ইমাম বুখারীর আল আদাবুল মুফরাদ, ইমাম আত-তিরমিযীর কিতাবুশ শামায়িল ইত্যাদি।
- ৪. দালায়িলুন নবূওয়াহ ও মু‘জিযাহ্ গ্রন্থ: যে সমস্ত গ্রন্থে নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নবুওয়াত ও রিসালাত প্রমাণ সংক্রান্ত বর্ণনা এবং মু‘জিযাহ্ স্থান পেয়েছে এমন গ্রন্থ হতে সীরাত বা জীবন-চরিত শিক্ষা করা।
- ৫. খাসায়িস গ্রন্থ: যে সমস্ত গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণিত হয়েছে।
- ৬. মাগাযী ও সিয়ার গ্রন্থ: যে সব গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পরিচালিত বিভিন্ন যুদ্ধ ও অভিযান অথবা তাঁর প্রেরিত অভিযান সংক্রান্ত বর্ণনা আলোকপাত হয়েছে এমন গ্রন্থ হতে সীরাত শিক্ষা করা।
- ৭. মক্কা-মদীনার ইতিহাস গ্রন্থ : নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর গোটা জীবন অতিবাহিত হয় মক্কা-মদীনায়। সুতরাং মক্কা-মদীনার নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থ হতে রাসূল (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত জানা যেতে পারে।
- ৮. ইসলামী ইতিহাস গ্রন্থ: যে সমস্ত ইসলামের ইতিহাস গ্রন্থ সাধারণভাবে সংকলন করা হয়েছে। যেমন- তারীখ ইবনু জারীর আত্ তাবারী, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনু কাসীর, আত্ তারিখ আল ইসলামী লিয যাহাবী ইত্যাদি। এসব গ্রন্থে ধারাবাহিক আলোচনায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত আলোকপাত করা হয়েছে। তা হতে সীরাত শিক্ষা নেয়া যায়।
- ৯. আরবী সাহিত্য গ্রন্থ: আরবী ভাষার স্বর্ণযুগ ছিল রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগ। সে যুগে চর্চিত আরবী ভাষা-সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সীরাত আলোচনা করা হয়েছে।
- ১০. গবেষণামূলক সীরাত গ্রন্থ: যেসব গ্রন্থ নির্ভরযোগ্য তথ্যের আলোকে গবেষণামূলক রচনা করা হয়েছে, সে গ্রন্থসমূহও সীরাত শিক্ষার উল্লেখযোগ্য ও সহজলব্ধ উৎস। কারণ ভাল-মন্দ বাছাই করে এ সব গ্রন্থ সংকলন করা হয়েছে। এ জাতীয় গ্রন্থ দু’ধরনের হতে পারে। কতগুলো পূর্ণ জীবনী গ্রন্থ। আবার কতগুলো অংশবিশেষ গ্রন্থ।
পূর্ণ জীবনী গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম হলো-
- (১) সীরাতুন্নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইমাম ইবনু কাসীর।
- (২) আস্ সীরাহ আন্ নাববীয়াহ আস্ সহীহাহ্ ড. আকরাম জিয়া আল ওমারী।
- (৩) আর রাহীকুল মাখতুম আল্লামা সফীউর রহমান মুবারকপুরী।
- (৪) আস্ সীরাহ আন্ নাববীয়াহ ফী যাওয়ি আল মাসাদির আল আস্ লিয়াহ ড. মাহদী রিযকুল্লাহ।
- (৫) সহীহ আস্ সীরাহ আন্ নাববীয়াহ শাইখ ইব্রা-হীম ‘আলী ইত্যাদি।
এগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষায় অনুবাদ প্রকাশ হয়েছে আর রাহীকুল মাখতুম ও সহীহ আস্ সীরাহ আন্ নাববীয়াহ।
সীরাতুর রাসূল (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কিত ‘জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা’ সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করা হলো। উপরের লেখনীটি মূল্যায়ন করলে স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান হয় যে, সিরাতুর রাসূল (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জ্ঞান ব্যতীত ‘ইল্ম অপূর্ণাঙ্গ। আর অপূর্ণাঙ্গ জ্ঞান মানুষকে ঈমানের পরিপূর্ণ স্বাদ থেকে বঞ্চিত করে। অতএব, প্রতিটি মুসলিমের জীবনে সিরাতুর রাসূল (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কিত জ্ঞানার্জনের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য।
টীকা:
[১] সূরা আয্ যা-রিয়া-ত ৫১ : ৫৬।
[২] সূরা আল ক্বলম ৬৮ : ৪।
[৩] সিলসিলাহ সহীহাহ্- হাঃ ৪৫।
[৪] সূরা আল হাশ্র ৫৯ : ৭।
[৫] সূরা আল আহ্যা-ব ৩৩ : ২১।
[৬] সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ৩১।
[৭] সূরা আল ক্বলম ৬৮ : ৪।
[৮] সহীহ মুসলিম- হাঃ ৭৪৬।





