শাইখ ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী

আশুরা-মুহাররমে নিষিদ্ধ ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ | শাইখ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী

হিজরী বর্ষের প্রথম মাস মুহাররম। যে চারটি মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ তন্মধ্যে একটি মাস মুর্হারম। ইসলামী শরী’আতে এ মাসে বিশেষ ‘ইবাদত হলো আশুরা মুর্হারমের সিয়াম। এছাড়া ভিন্ন কোনো বিশেষ ‘ইবাদত বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়। হাদীসে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا)، قَالَ : قَدِمَ النَّبِيُّ ﷺ المَدِيْنَةَ فَرَأَى اليَهُوْدَ تَصُوْمُ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ، فَقَالَ :  مَا هَذَا؟، قَالُوْا : هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللهُ بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوْسٰى، قَالَ :  فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوْسٰى مِنْكُمْ، فَصَامَهُ، وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ.

“আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: নাবী (সাঃ) যখন মদীনায় আগমন করলেন তখন দেখলেন যে ইয়াহূদী সম্প্রদায় দশই মুহাররমে আশুরার সিয়াম পালন করছে। তিনি প্রশ্ন করলেন, একি বিষয়? তারা বলল, এ হলো পবিত্র দিন, যে দিনে আল্লাহ তা’আলা বানী ইসরা-ঈলকে তাদের শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করেছেন, ফলে মূসা (আঃ) সে দিনটি শুকরীয়াস্বরূপ সিয়াম রেখেছেন (আমরাও তার অনুসরণ করে রাখছি)। নাবী (সাঃ) বললেন: আমি তোমাদের চেয়ে মূসা (আঃ)-এর মতো সিয়াম রাখার বেশী অধিকার রাখি, অতঃপর তিনি সিয়াম রাখেন এবং অন্যদের সিয়াম রাখার নির্দেশ দেন। [৩৪]

ইসলামের পূর্ব যুগ হতেই এ সিয়ামের প্রচলন ছিল। অতঃপর নাবী (সাঃ)-এর মাধ্যমে তা ইসলামের ‘ইবাদত হিসাবে গণ্য হয়। ‘আয়িশাহ্ (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহা) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করে গেলেন তখন তিনি নিজে সিয়াম রাখলেন এবং অন্যদেরকে সিয়াম রাখার নির্দেশ দিলেন, অতঃপর যখন রামাযানের সিয়াম ফরয হলো তখন তিনি বললেন: যার ইচ্ছা হয় আশুরার সিয়াম রাখবে আর যার ইচ্ছা হয়, রাখবে না। [৩৫]

নাবী (সাঃ) সর্বপ্রথম আশুরার সিয়াম হিসাবে মুহাররম মাসের দশ তারিখে শুধু একটি সিয়াম রাখেন এবং সে দিনটির ফযীলত বর্ণনা করেন। অতঃপর দশম হিজরীতে নাবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে ইয়াহূদী সম্প্রদায় এ দিনটিকে খুব মর্যাদা দেয় এবং সে দিনটিতে সিয়াম রাখে? তখন নাবী (সাঃ) বললেন: যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে নবম তারিখও সিয়াম রাখব। কিন্তু আগামী বছর আসার পূর্বেই তিনি দুনিয়া হতে বিদায় নেন। [৩৬]

অতএব দশম তারিখের আগে একদিন, সম্ভব না হলে পরে একদিন যোগ করে দু’দিন সিয়াম রাখা উত্তম।

আশুরার সিয়াম বড় ফযীলতপূর্ণ, এর বদৌলতে শুধু সওয়াবই পাওয়া যায় না; বরং পূর্বের এক বছরের অপরাধ মোচন হয়ে যায়। নাবী (সাঃ) বলেন: আমি আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশাবাদী যে, আশুরার দিবসের সিয়ামের বিনিময়ে তিনি পূর্বের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ মোচন করে দিবেন। [৩৭]

অতএব কুরাআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে অন্য মাস বা দিন এর ন্যায় দশই মুর্হারামে একই ‘ইবাদত, তবে বিশেষ ‘ইবাদত হলো সিয়াম রাখা। কিন্তু চরমপন্থী শিয়দের কাছে এ দিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শোক পালন করা, মুর্ছিয়া গওয়া, তাজিয়া মিছিল বের করা ইত্যাদী তাদের কাজ। মূলতঃ তাদের ঐসব কর্মকা- মুহাম্মদ (সাঃ)-এর দীন-ধর্মে ভিত্তিহীন। তাদের সংস্পর্শে থেকে প্রভাবিত হয়ে এক শ্রেণির সুন্নীরাও এদিনটিকে গুরুত্ব¡ দিয়ে মিলাদ মাহফিল, খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি গর্হিত কর্মে লিপ্ত হয়ে থাকে। আমরা এ প্রবন্ধে আশুরা-মুহাররমে নিষিদ্ধ ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ অতি সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করার চেষ্টা করব যাতে পাঠকবৃন্দ ঐ সব নিষিদ্ধ ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ হতে বিরত থাকতে পারে।

শী’আহ্ ও খারেজী দু’টি সীমালঙ্ঘনকারী বিপরীতমুখী দল। শী’আরা শোক পালনের নামে সীমালঙ্ঘ করেছে, আর খারেজীরা তাদের বিরোধিতায় সীমালঙ্ঘন করেছে। উভয় দলের আশুরা মুর্হারামকে কেন্দ্র করে কিছু গর্হিতকর্ম নিম্নে তুলে ধরা হলো-

১. শী’আহ্দের গর্হিত কম শোক পালন করা; সর্বপ্রথম শী’আহ্ ও চরমপন্থী রাফেযীরা এই দিনে শোক পালন করা তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে গ্রহণ করে। বুক চাপড়ানো, গাল চাপড়ানো, রক্তাক্ত করা, কাপড় ছেঁড়া সবকিছু তাদের বিশেষ কর্ম হিসেব করে থাকে। মূলতঃ এগুলো কিছু জাল ও মনগড়া কথা কে সামনে রেখেই মর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী শরী’আতে এসবই ভিত্তিহীন ও নিষিদ্ধ।

২. আশুরা মুর্হারমকে ধর্মীয় ঈদ হিসেবে পালন করা; এটি মূলতঃ শী’আদের বিপরীত গ্রুপ যারা আহলে বাইতকে কষ্ট দেওয়া আনন্দদায়ক মনে করে, সেই শ্রেণীর খারেজীদের কর্ম। কারণ ইসলামী শরী’আতে ঈদুল আযহা এবং ঈদ-উল-ফিতর ছাড়া অন্য কোনো ঈদ নেই। তাদের এই দিনে আনন্দ উৎসব পালন করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এ দিনটিতে শোক পালন যেমন বৈধ নয়। আনন্দ উৎসব পালন করাও তেমন বৈধ নয়। কেননা ইসলামি শরী’আতে এই দিনটিতে বিশেষ ‘ইবাদত হলো সিয়াম পালন করা, সেদিনে কোনোভাবেই আনন্দ উৎসব হতে পারে না।

৩. এ দিনে বিশেষভাবে সুরমা ও মেহেদী ব্যবহার করা; এটা মূলতঃ ঈদ উৎসবেরই একটি অংশ। যা কিছু বানানো হাদীস ও মনগড়া কথাকে সামনে রেখেই পালন করা হয়ে থাকে। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ্ (রাহিমাহুল্লা-হ) বলেন: আশুরার দিনে গোসল করা সুরমা ব্যবহার করা মেহেদি লাগানো এই জাতীয় কর্মসমূহ কখনো কোনো মুসলিম ইমাম ভালো মনে করেননি।

৪. আশুরার দিনে পরিবারে ভালো খাওয়া পড়ার ব্যবস্থা করা; এটাও মূলতঃ একটি গর্হিত অপরাধ। কিছু জাল হাদীসকে কেন্দ্র করে এদিনে এসব কাজ করা হয়ে থাকে, যা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ্ (রাহিমাহুল্লা-হ) বলেন: এ বিষয়ে নাবী (সাঃ) হতে কোনো সহীহ হাদীস প্রমাণিত হয়নি। সাহাবীদের হতেও না এবং প্রসিদ্ধ চার ইমামসহ মুসলিমদের বিশেষ গ্রহণযোগ্য কোনো ইমামও এটাকে ভালো মনে করেননি।

৫. আশুরার দিনে বিশেষ বিশেষ খাওয়ার আয়োজন করা; যেমন- ঈদুল আযহার গোশত আশুরার দিনে খাওয়ার জন্য রেখে দেওয়া এবং এর গুরুত্ব বর্ণনা করা অনুরূপভাবে আরো বিশেষভাবে সেই দিনে পশু জবাই করে খাওয়া-দাওয়া করা ইত্যাদি সবগুলো নিষিদ্ধের অন্তর্ভুক্ত।

৬. পশু যবেহ করা; আশুরাকে মর্যাদা প্রদানের উদ্দেশ্যে গরু, ছাগল, মুরগি বিশেষভাবে যবাই করা এটিও এক প্রকার র্শিক।

৭. আল-অযীয়াহ; কোনো কোনো অঞ্চলে প্রচলন রয়েছে যে, আশুরার দিনে কয়েক পরিবার মিলে বা পাড়ার মানুষেরা মিলে গরু ক্রয় করে যবাই করে সকলে বন্টন করে নেবে। এই দিনে বাপ-দাদার আন্তার আগমন ঘটে। তাই তাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য এ কাজ করা হয়। বিশেষ করে যখন কোনো ওলী-আউলিয়ার কবরকে অথবা মাযারকে কেন্দ্র করে এ কাজ করা হয়, তখন তা প্রকাশ্য র্শিকে পরিণত হয়।

৮. রাতে কাপড় সেলাই ও লেখা লেখি কাজ করা নিষিদ্ধ মনে করা; আশুরা কে কেন্দ্র করে যে সমস্ত বাতিল ‘আক্বীদাহ্ ও কর্ম সেগুলোর মধ্যে এটি একটি অন্যতম।

৯. আশুরার রাতে কান্নাকাটি ও ঝগড়া-তর্ক নিষেধ করা; তাদের ‘আক্বীদাহ্ বিশ্বাস হলো এরাতে এসব করলে জিন্-এর নৈকট্য হাসিল সম্ভব নয়, তাই জিন্- শয়ত্বানের ভয়ে এবং তাদেরকে খুশি করার চিন্তায় এর কাজ করা হয়। যা প্রকাশ্য র্শিক।

১০. বিশেষভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করা; এ রাতে যে সমস্ত মনগড়া কর্ম হয়ে থাকে সেগুলোর মধ্যে আরেকটি হচ্ছে জিন্-এর নৈকট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করা।

১১. চুল কাটা বা ছোট করা; আশুরা মুর্হারমকে কেন্দ্র করে এদিন চুল কাটা বা ছোট করা, যার কোনো ভিত্তি নেই।

১২. সিয়াম পালনে সীমালঙ্ঘন করা; নাবী (সাঃ) হতে যে পরিমাণ আশুরার সিয়াম সাব্যস্ত নয় সেই পরিমাণ সিয়াম পালন করা। যেমন- মুহাররমের প্রথম দশক সিয়াম পালন করা, অথবা ৯, ১০, ১১ ছাড়াও আরো বেশি সিয়াম পালন করা।

১৩. মহরম মাসে যাকাত প্রদান করা; এদিনে যাকাত প্রদানের বেশি সওয়াব চিন্তা করে যাকাত প্রদান করা। এটি একটি গর্হিত কাজ কারণ যাকাত প্রদান করতে হয়, যার যখন ফরয হয়। এর কোন শরী’আত কর্তৃক নির্দিষ্ট মাস বা দিন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। তাই আশুরা মুর্হারমের দিনকে যাকাত প্রদানের দিন হিসাবে নির্ধারণ করে নেওয়া এক প্রকার বিদআত।

১৪. আশূরা মুহাররমে নাবী (সাঃ) হিজরত করেছেন এমন ধারণা করা; সে দৃষ্টিতে এ দিনটির বেশি গুরুত্ব দেওয়া যা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং শরী’আতের দিক থেকে বর্জনীয় ও গর্হিত কাজ। কারণ নাবী (সাঃ)-এর হিজরত ছিল রবিউল আউয়াল মাসে।

১৫. কবর যিয়ারত করা; আশুরার দিনে বিশেষ ফযীলতের উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করা একটি বিদআত। কারণ সাধারণত ঈদের দিন হিসেবে কিছু মানুষ কবর যিয়ারত করে, অনুরূপ শী’আহ্ বিরোধীরা ঈদ হিসেবে মনে করে কবর যিয়ারত করে থাকে যা উভয় দিক থেকে গর্হিত।

১৬. আশূরা মুহাররমে ‘আক্বীক্বার ব্যবস্থা করা; ইসলামি শরী’আতে নিয়ম হলো সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে ‘আক্বীক্বাহ্ করা, অন্য কোনো দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকা নয়। তা না করে মুহাররমের অপেক্ষায় থেকে ‘আক্বীক্বাহ্ করা একটি গর্হিত কাজ।

১৭. আশুরা মুহাররমের রাতে বিশেষ ‘ইবাদত করা; ইসলামী শরী’আতে আশুরার দিবসে সিয়াম পালন করা শরী’আত সম্মত। কিন্তু রাতের বেলা বিশেষ কোনো ‘ইবাদত শরী’আত সম্মত নয়। তাই এটাও একটা বিদআত।

১৮. আরো কিছু গর্হিত কাজ; যেমন- মনে করা হয় আশূরা মুহাররমে ১২টি কাজ করতে হয়: সালাত আদায় করা, সিয়াম পালন করা, আত্মীয়ের খোঁজ-খবর নেয়া, দান-সাদাক্বাহ্ করা, গোসল করা, সুরমা ব্যবহার করা, ‘আলেমদের খোঁজ-খবর নেয়া, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ-খবর নেয়া, এতিমের মাথায় হাত বুলানো, পরিবারে খাওয়া পড়ার ব্যবস্থা করা, নখ কাটা ও ১০০০ বার সূরা আল ইখলাস পড়া।

১৯. মুহাররম মাসে বিবাহ-শাদী বন্ধ রাখা; এ মাসটি শোকের মাস হিসেবে বিবাহ জাতীয় আনন্দের কাজ বন্ধ রাখা। এটাও নিষিদ্ধ কারণ ইসলামে বিবাহের জন্য কোনো নিষিদ্ধ মাস নেই।

এছাড়াও আরো বহু গর্হিত কাজ রয়েছে যা বিশেষভাবে আশুরা মুহাররমকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়ে থাকে। প্রত্যেক মুসলিমের একান্ত কর্তব্য এসব নিষিদ্ধ কর্ম হতে নিজে বিরত থাকা এবং সাধ্য-সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যকে বিরত রাখা। আল্লাহ তা’আলা আমাদের তাওফীক্ব দান করুন আমীন!

 

টীকা:

[৩৪] সহীহুল বুখারী- হাঃ ২০০৪, সহীহ মুসলিম- হাঃ ১১৩০।

[৩৫] সহীহ মুসলিম- হাঃ ২৬৩২।

[৩৬] সহীহ মুসলিম- হাঃ ২৬৬১।

[৩৭] সহীহ মুসলিম- হাঃ ১৯৭৬।

Share With
Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
সর্বশেষ পোস্ট
মাননীয় ধর্ম উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন হাফিযাহুল্লাহ-এর বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং মাদরাসা মুহাম্মাদীয়া আরাবীয়া পরিদর্শন ও সংবর্ধনা সভা-২০২৪ গতকাল সফলভাবে সুসম্পন্ন হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।
Special Web Offer
Do you want to Create your Own or Business's Digital Appearance