শাইখ ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী

হজ্জ যাত্রার পূর্বে ওসীয়ত ও নসীহত | শাইখ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী

হে সম্মানিত হাজী ভাই ও বোন! সত্যিই আপনি আজ সৌভাগ্যবান; কেননা লক্ষ-কোটি জনতার মধ্য হতে আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে তাঁর পবিত্র ঘর কা’বাতে হজ্জব্রত পালন করার জন্য নির্বাচন করেছেন ও তাওফীক্ব দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿إِلَّا الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَعَمِلُوْا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ﴾

অর্থ: “(ক্ষতিগ্রস্ত হতে মুক্ত তারা) যারা ঈমান আনে সৎকর্ম করে এবং পরস্পরে সত্যনিষ্ঠ ও ধৈর্য্য ধারনের উপদেশ দিয়ে থাকে।”[৭০]

এ মর্মে সম্মানিত হাজী ভাই ও বোনদের প্রতি আমাদের উপদেশ:

  • প্রথম উপদেশ হলো তাক্বওয়াল্লাহ বা আল্লাহ ভীতির, এ তাক্বওয়া একজন মুসলিমের মৃত্যু পর্যন্ত সর্বদাই থাকা উচিত আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اتَّقُوْا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوْتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُوْنَ﴾

অর্থ: “ওহে যারা ঈমান এনেছে! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাকে ভয় করা উচিত, আর মুসলিম (আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমপর্ণকারী) না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।”[৭১]

তাক্বওয়াল্লাহ-এর মূল হলো দু’টি বিষয়:

১. মহান আল্লাহর আদেশসমূহ পালন করা এবং

২. তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ হতে বিরত থাকা, নচেত শুধু মৌখিক তাক্বওয়ার দ্বারা মহান আল্লাহর ‘আযাব হতে নিস্কৃতি পাওয়া অসম্ভব।

  • তাওবাহ্ করা : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَتُوْبُوْا إِلَى اللهِ جَمِيْعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ﴾

অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবাহ্ করো, অবশ্যই তোমরা সফলকাম হবে।”[৭২]

তাওবাহ্ শুধু সকালে ১০০ বার আর সন্ধ্যায় ১০০ বার পাঠ করলে হবে না বরং তাওবাতুন্নাসূহা (সত্য তাওবাহ্) হতে হবে। তাওবাতুন্নাসূহা বা তাওবাহ্ কবূলের জন্য পাঁচটি শর্ত থাকা আবশ্যক, তা হলো-

ক) একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য তাওবাহ্ করা, কারো দেখান বা প্রশংসার উদ্দেশ্যে নয়।

খ) কৃত অপরাদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হওয়া।

গ) কৃত অপরাধ সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে তা থেকে মুক্ত হওয়া, কেননা তাওবাহ্ করা, আবার অপরাধে লেগে থাকা মুনাফিকী ও মহান আল্লাহর সাথে ঠাট্টার শামিল।

ঘ) কৃত অপরাধ ভবিষ্যতে না করার প্রতিজ্ঞা করা।

ঙ) সময়ের মধ্যে তাওবাহ্ করা, তা ব্যক্তির মৃত্যু উপস্থিত হওয়ার পূর্বে। আর সকলের জন্য সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হওয়ার পূর্বে।

  • ইবাদত কবূলের শর্ত অনুযায়ী হওয়া : একজন মুসলিমের ‘ইবাদত মহান আল্লাহর কাছে কবূল হওয়ার জন্য দু’টি শর্ত থাকা অপরিহার্য:

ক) ইখলাসের সাথে মহান আল্লাহর ‘ইবাদত করা, আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿وَمَا أُمِرُوْا إِلَّا لِيَعْبُدُوْا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ حُنَفَاءَ وَيُقِيْمُوْا الصَّلَاةَ﴾

অর্থ: “আর তারাতো একমাত্র আল্লাহর জন্য দ্বীনকে খালেস করে একনিষ্ঠতার সাথে ‘ইবাদত করারই আদেশপ্রাপ্ত হয়েছে।”[৭৩]

সুতরাং যেকোন ‘ইবাদত একমাত্র মহান আল্লাহর জন্যই হতে হবে, এর সাথে লোক দেখান বা অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকলে তা র্শিকে পরিণত হবে, ফলে আল্লাহ তা‘আলা কখনও কবূল করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُوْنَنَّ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ﴾

অর্থ: “যদি তুমি র্শিক করো তাহলে অবশ্যই তোমার ‘আমল (‘ইবাদত) বরবাদ হয়ে যাবে, আর তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পরবে।”[৭৪]

এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে অনেক দলীল-প্রমাণ রয়েছে।

খ) রাসূল (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পূর্ণ অনুসরণ করে ‘ইবাদত করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا﴾

অর্থ: “আর রাসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করো।”[৭৫]

সুতরাং রাসূল (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণ করে প্রতিটি ‘ইবাদত করা ফরজ, নচেত তা বিদআতে পরিণত হয়ে যাবে, আর বিদআতী ‘আমল মহান আল্লাহর কাছে কবূল হবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَطِيْعُوْا اللهَ وَأَطِيْعُوْا الرَّسُوْلَ وَلَا تُبْطِلُوْا أَعْمَالَكُمْ﴾

অর্থ: “ওহে যারা ঈমান এনেছে! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য এবং রাসূলের অনুসরণ করো, আর (এ দু’টি সূত্র বর্জন করে) তোমাদের ‘আমলসমূহ নষ্ট করো না।”[৭৬]

নবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:

 مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ.

যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ (‘ইবাদত) করল অথচ সে বিষয়ে আমাদের কোন আদেশ উপদেশ নেই তা বর্জনীয়, অগ্রহণযোগ্য। [৭৭]

অর্থাৎ- মহান আল্লাহর কাছে কবূল হবে না। তাই সম্মানিত হাজী ভাই ও বোনদের বলতে চাই আপনার এ হজ্জ এবং যাবতীয় ‘ইবাদত র্শিক ও বিদ‘আত হতে মুক্ত করুন, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে এ তাওফীক্ব দান করুন! এবং আমাদের ‘ইবাদতসমূহ কবূল করে নিন আমীন!!

  • অন্যায় ও অশ্লীলতা বর্জন করা: এ অপরাধগুলো সর্বক্ষেত্রে বর্জন করা উচিত, বিশেষ করে হজ্জ-এর ইহরাম হতে শেষ পর্যন্ত বর্জন করা অপরিহার্য, নচেত হজ্জ সফল হবে না। যেমন- আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُوْمَاتٌ فَمَنْ فَرَضَ فِيْهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوَقَ وَلَا جِدَالَ فِىْ الْحَجِّ﴾

“হাজ্জের মাসসমূহ সুবিদিত। অতএব যে এর মধ্যে হজ্জকে র্ফয করে নিবে, সে হজ্জে অশ্লীল, অন্যায় ও কলহ বিবাদ করবে না। [৭৮]

নবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:

 مَنْ حَجَّ لِلّٰهِ فَلَمْ يَرْفُثْ، وَلَمْ يَفْسُقْ، رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ .

যে ব্যক্তি অশ্লীলতা ও অবাধ্যতা হতে মুক্ত থেকে মহান আল্লাহর জন্য সুন্দরভাবে হজ্জব্রত পালন করল, সে নিস্পাপ হয়ে ফিরল সেদিনের মতো, যেদিন তার মাতা তাকে জন্ম দিয়েছিল। [৭৯]

  • হে সম্মানিত হাজী ভাই ও বোন! ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাজারের রং-বেরঙের বহু ধরণের প্রমাণবিহীন হজ্জ ও ‘উমরাহ্ শিক্ষার ভুল-ভ্রান্তিপূর্ণ পুস্তক অনুসরণে আপনার হজ্জ ও ‘উমরাহ্ বিনাশ হয়ে যাওয়া কোন অসম্ভব নয়। তাই কেবল মাত্র কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীস হতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ্য বই অনুসরণ করে হজ্জ ও ‘উমরাহ্ পালন করার চেষ্টা করুন এবং মনগড়া-বানোয়াটি বই পুস্তক অনুসরণ হতে বিরত থাকুন।

হে আল্লাহ! আমাদের সকলকে সঠিক পথে হিদায়াত দান করুন এবং আমাদের সঠিকভাবে ‘ইবাদত করার তাওফীক্ব দিয়ে তা কবূল করে নিন! বদলা হিসাবে আপনার সন্তুষ্টি ও জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন আমীন!

 

টীকা:

[৭০] সূরা আল ‘আসর: ৩।

[৭১] সূরা আলে ‘ইমরান: ১০২।

[৭২] সূরা আন্ নূর: ৩১।

[৭৩] সূরা আল বাইয়্যেনাহ্ : ৫।

[৭৪] সূরা আয্ যুমার : ৬৫।

[৭৫] সূরা আল হাশর : ৭।

[৭৬] সূরা মুহাম্মাদ : ৩৩।

[৭৭] সহীহুল বুখারী- ৩/৬৯, ৯/১০৭; সহীহ মুসলিম- হা: ১৮/১৭১৮।

[৭৮] সূরা আল বাকারাহ : ১৯৭।

[৭৯] সহীহুল বুখারী- হা: ১৫২১।

Share With
Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
সর্বশেষ পোস্ট
মাননীয় ধর্ম উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন হাফিযাহুল্লাহ-এর বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং মাদরাসা মুহাম্মাদীয়া আরাবীয়া পরিদর্শন ও সংবর্ধনা সভা-২০২৪ গতকাল সফলভাবে সুসম্পন্ন হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।
Special Web Offer
Do you want to Create your Own or Business's Digital Appearance