শাইখ ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী

হাদীসশাস্ত্রে ইলমুর রিজাল গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা | শাইখ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী

হাদীস শাস্ত্রে ইলমুর রিজাল-এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সংশ্লিষ্ট অতীব জরুরী প্রাথমিক আলোচনা: ইসলাম আল্লাহ তা’আলা প্রদত্ত একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। এ জীবন ব্যবস্থার মূল গাইড হলো আল-কুরআনুল কারীম। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ﴾

“রমাযান মাস এতে মানুষের দিশারী (গাইড) এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য ও অসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করা হয়েছে”। [৩৮]

আল কুরআনে ইসলামের বিষয়সমূহ সবিস্তারে আলোচনা করা হয়নি, তাই এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিবরণ হলো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীস। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُوْنَ﴾

“এবং তোমার প্রতি আল কুরআন অবর্তীর্ণ করেছি। মানুষকে সুস্পষ্ট বিবরণ দেয়ার জন্য যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা করে”। [৩৯]

মূলতঃ আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কুরআন ও হাদীস উভয়ই পেয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:

 إِنِّىْ أُوتِيْتُ الْكِتَابَ، وَمِثْلَهُ مَعَهُ.

“আমি কিতাব (কুরআন) এবং সেটার সাথে অনুরূপ (হাদীস মহান আল্লাহর পক্ষ হতে) পেয়েছি।”[৪০]

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন:

﴿وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا﴾

“রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাকো”। [৪১]

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বক্তব্য, কর্ম ও সম্মতির মাধ্যমে আমাদেরকে যা দিয়েছেন তার নামই হাদীস। হাদীসও ওয়াহী এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

﴿وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى  إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوْحَى﴾

“তিনি মনগড়া কোন কথা বলেন না, বরং এটা ওয়াহি- যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।”[৪২]

সুতরাং ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় কুরআনের পরই দ্বিতীয় গাইড বা দিশারী হলো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীস এবং বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত হলে তা মানা অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:

كُلُّ أُمَّتِىْ يَدْخُلُوْنَ الجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى، قَالُوْا : يَا رَسُوْلَ اللهِ، وَمَنْ يَأْبَى؟ قَالَ :  مَنْ أَطَاعَنِىْ دَخَلَ الجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِىْ فَقَدْ أَبَى.

“আমার সকল উম্মাতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে যারা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে তারা ব্যতীত। সাহাবী (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহুম)-গণ জিজ্ঞাসা করলেন, কারা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে? তিনি বললেন, যে আমার অনুসরণ করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অনুসরণ করে না, অমান্য করে সেই অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে।”[৪৩]

অতএব, ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় কুরআন ও হাদীসের কোন বিকল্প নেই। আবার শুধু কুরআন বা শুধু হাদীসের মাধ্যমেও হতে পারে না বরং কুরআনের সাথে হাদীস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, উভয়েরই অনুসরণ অপরিহার্য। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর অবর্তমানে সাহাবীদের যুগের শেষের দিকে কুরআন হাদীসের অনুসরণের গুরুত্ব যথার্থ থাকলেও নির্ভরযোগ্যতা ও আস্থার দিক থেকে উভয়ের মাঝে বিশাল পার্থক্য দেখা যায়। কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা গ্রহণ করেন, তিনি বলেন:

﴿إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ﴾

“আমিই আল কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমিই সেটার সংরক্ষক।”[৪৪]

আল কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ তা’আলার হাতেই, বিধায়, নির্ভরযোগ্যতা ও আস্থায় আঘাত হানার চেষ্টা করেও কেউ সফল হতে পারেনি এবং পারবেও না। কিন্তু হাদীসের ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম, যার ফলে সার্থ্যান্বেষী মহল এবং ইসলামদ্রোহী অপশক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও প্রসিদ্ধ সাহাবীদের বরাতে বহু জাল-বানোয়াট হাদীস তৈরির পায়তারা শুরু করে। প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে আল্লাহ তা’আলা বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির মাধ্যমে হাদীস সংরক্ষণ করেছেন। হাদীস সংরক্ষণে বিশেষ ব্যক্তিদের প্রচেষ্টায় যে শাস্ত্র রচিত হয়েছে তারই নাম “মুসত্বালাহুল হাদীস/مصطلح الحديث।”[৪৫] (مصطلح الحديث) মুসত্বালাহুল হাদীস প্রাথমিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত:

(১) علم الرواية  (ইলমুর রিওয়ায়াহ্) যার আলোচ্য বিষয় হাদীসের মতন বা মূলভাষ্য।

(২) علم الدراية  (ইলমুদ দিরায়াহ্) যার আলোচ্য বিষয় হাদীসের সনদ বা সূত্র।

علم الدراية বা হাদীসশাস্ত্রের সনদ বিষয়ক আলোচনার নামই علم الرجال (ইলর্মু রিজাল); যার মূল আলোচ্যবিষয় হাদীস বর্ণনাকারীগণ গ্রহণযোগ্য না অগ্রহণযোগ্য। [৪৬]

ইলমুর রিজালের পরিচয়, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:

ইলমুরিজাল (علم الرجال) -এর পরিচয়: ‘ইলমুর রিজাল-এর অপর নাম ‘ইলমুল ইসনাদ’ বা ‘ইলমুস সানাদ, অর্থাৎ- ইসনাদ বা সনদ সম্পর্কীয় জ্ঞান গবেষণাকেই ইলমুর রিজাল বলা হয়।  মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় الاسناد  বা السند  হলো: (سلسلة الرجال الموصلة للمتن) “ব্যক্তিবর্গের ধারাবাহিকতা যা মতনে (হাদীসের মূলভাষ্যে) পৌঁছে দেয়।”[৪৭]

অর্থাৎ-যে সমস্ত হাদীস বর্ণনাকারীর মাধ্যমে হাদীসের মূলভাষ্যে পৌঁছা যায়, এরই নাম الاسناد  বা السند  বা الرجال , আর বর্ণনাকারীদের নিয়ে যে জ্ঞান-গবেষণা তাকেই বলা হয় ‘ইলর্মু রিজাল (علم الرجال) । [৪৮]

ইলমুর রিজালের সূচনা: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে ‘ইলমুর রিজালের আলোচনা স্থান পেলেও প্রয়োজন না থাকায় কার্যসূচনা ঘটেনি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ইন্তিকালের পর পরই হাদীস বর্ণনার সত্যতা যাচাই-বাছাই-এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে ‘ইলমুর রিজাল বা রিজাল শাস্ত্রের সূচনা হয়। সহীহ মুসলিমে এসেছে সাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা সাহাবী উবাই ইবনু কা’ব (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর মাজলিসে ছিলাম, হঠাৎ আবূ মূসা আশ‘আরী (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) ভীত হয়ে আমাদের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, আমি আল্লাহ তা’আলার ওয়াসতে বলছি, আপনাদের মাঝে কি এমন কেউ আছেন? যিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন যে, “তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করবে, যদি অনুমতি দেয় প্রবেশ করবে, নচেৎ ফিরে যাবে।”উবাই (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বললেন, বিষয়টা কি? আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন, আমি গতকাল ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর কাছে তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করেছি, অনুমতি পাইনি তখন ফিরে গিয়েছি। অতঃপর আজ পুনরায় তাঁর কাছে গেলাম এবং বললাম যে, গতকাল আমি আপনাকে তিনবার সালাম দেয়ার পর ফিরে গিয়েছি। ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন, হ্যাঁ আমরা শুনেছিলাম, কিন্তু খুব ব্যস্ত ছিলাম। তবে তুমি কেন অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত অনুমতি চাইতে থাকলে না? আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হতে যেভাবে শুনেছি সেভাবেই অনুমতি চেয়েছি। (অর্থাৎ- তিনবার সালামের পর ফিরে যেতে হবে)। তখন ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বললেন, “আল্লাহর কসম করে বলছি! তুমি তোমার সাক্ষী উপস্থিত করো, নইলে তোমাকে কঠিন শাস্তি দেব।”উবাই (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-কে বললেন, হ্যাঁ আমাদের সবচেয়ে ছোট মানুষই এ সাক্ষীর জন্য যথেষ্ট, হে আবূ সাঈদ তুমি যাও। অতঃপর আমি ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর কাছে গেলাম এবং বললাম, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে এরূপ বলতে শুনেছি। [৪৯]

ইমাম নাবাবী (রাহিমাহুল্লা-হ) বলেন, মূলতঃ ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) সাহাবী আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর সততায় কোন সন্দেহ পোষণ করেননি বরং তিনি সতর্কতা অবলম্বন করেছেন যাতে বিদআতী, মিথ্যুক ও মুনাফিক্বরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নামে মিথ্যাচার ছড়াতে না পারে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নামে মিথ্যা ও জাল হাদীসের পথ বন্ধ করার জন্যই তিনি এ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে ‘ইলমুর রিজলের সূচনা করেন। [৫০]

ইমাম ইবনু হিব্বান (রাহিমাহুল্লা-হ) (মৃত্যু ৩৫৪ হিজরী) বলেন:

وهذان اول من فتش عن الرجال فى الرواية وبحثا عن النقل فى الأخبارثم تبعهماالناس على ذالك……

“এ দু’জনই [আবূ বকর ও ‘উমার (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু)] [৫১]

সর্ব প্রথম হাদীসের ক্ষেত্রে রিজাল বা বর্ণকারীদের এবং বর্ণনা সম্পর্কে যাচাই-বাছাই ও গবেষণা শুরু করেন অতঃপর অন্যরা তাঁদের অনুসরণ করে অগ্রসর হন। [৫২]

সুতরাং ‘ইলমুর রিজালের সূচনা সাধারণ কোন মুহাদ্দিস এমনকি সাধারণ সাহাবীদের হতেও নয়, বরং খুলাফায়ে রাশিদীনের শিরোমনি আবূ বক্র ও ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু ‘আন্হু) হতেই এর বরকতময় সূচনা ঘটেছে। অতঃপর তার পরিধি বিস্তার লাভ করেছে।

ইলমুর রিজালের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা: ‘ইলমুর রিজাল একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাদীসশাস্ত্রে এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এ শাস্ত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা স্থান পেয়েছে পবিত্র কুরআনে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীসে, সাহাবী ও তাবি‘ঈদের বক্তব্যে এবং মুহাদ্দিসগণের গবেষণায় সুতরাং এমন বিষয়কে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই। ‘ইলমুর রিজালের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অতি সংক্ষিপ্তভাবে নিম্নে আলোচনা করা হলো।

(ক) আল কুরআনের আলোকে ‘ইলমুর রিজাল: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِن جَاءكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأٍ فَتَبَيَّنُوْا﴾

“হে মু’মিনগণ! যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোন বার্তা নিয়ে আসে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখো।”[৫৩]

আল্লাহ তা’আলা মুমিনদের নির্দেশ দেন যে, বার্তাবাহক যদি ন্যায় নিষ্ঠাবান না হয় তাহলে তার বার্তা পরীক্ষা না করে গ্রহণ করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীসের সর্বপ্রথম বাহক হলেন সাহাবীগণ, তাঁরা সকলেই আদিল বা ন্যায়-নিষ্ঠাবান ছিলেন, তাই নির্দ্বিধায় তাঁদের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু তাঁদের পরবর্তী যুগে হাদীস বর্ণনাকারীগণ সকলেই আদিল বা ন্যায়-নিষ্ঠাবান ছিলেন না, বরং তাদের মাঝে ফাসিক-পাপাচারী এমনকি ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীও ছিল। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ অনুযায়ী হাদীস গ্রহণে ‘ইলমুর রিজাল-এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। [৫৪]

আলোচ্য আয়াতের আলোকে ইমাম ইবনু কাসীর ও ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লা-হ) ‘ইলমুর রিজালের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করেন। [৫৫]

(খ) হাদীসে রাসূলুল্লাহর আলোকে ‘ইলমুর রিজাল: ‘ইলমুর রিজালের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হতে অনেক হাদীস এসেছে; যার নমুনা এখানে অতি সংক্ষেপে কিছু উল্লেখ করা হলো:

(১) عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ :  مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ .

(১) সাহাবী আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিয়াল্লাহু ‘আন্হু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত আমার ব্যাপারে মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার স্থান নির্ধারণ করে নেয়।”[৫৬]

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ব্যাপারে পক্ষে বা বিপক্ষে সকল ক্ষেত্রে মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করা সকলের ঐকমত্যে হারাম। [৫৭]

অতএব হাদীস পেলেই বর্ণনা করা যাবে না, বরং তা সত্য না মিথ্যা যাচাই করা অপরিহার্য। এজন্য প্রয়োজন ‘ইলমুর রিজাল বা রিজল শাস্ত্রের জ্ঞান। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হতে অনেক হাদীস শুনলেও ত্রুটির ভয়ে অনেকেই সব হাদীস বর্ণনা করেননি। যেমন- সাহাবী আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) [৫৮] ও সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) [৫৯] প্রমুখ।

(২) عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ :  كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ .

প্রসিদ্ধ সাহাবী আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “কোন ব্যক্তি মিথ্যুক হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বর্ণনা করবে।”[৬০]

অর্থাৎ- সত্য-মিথ্যা, বাস্তব-অবাস্তব এবং হক্ব-বাতিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া শুনামাত্রই নির্বিচারে হাদীস বর্ণনা করা মিথ্যুক হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সুতরাং হাদীস বর্ণনার বিষয়টি খুব সহজ নয়। হাদীসটির সকল দিক বিশেষ করে রিজাল বা বর্ণনাকারীগণ ন্যায়-নিষ্ঠ কি-না, তা যাচাই করা আবশ্যক। অতএব, হাদীসশাস্ত্রে ‘ইলমুর রিজালের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُوْلُ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ :  يَكُوْنُ فِىْ آخِرِ الزَّمَانِ دَجَّالُوْنَ كَذَّابُوْنَ، يَأْتُوْنَكُمْ مِنَ الْأَحَادِيْثِ بِمَا لَمْ تَسْمَعُوْا أَنْتُمْ، وَلَا آبَاؤُكُمْ، فَإِيَّاكُمْ وَإِيَّاهُمْ، لَا يُضِلُّوْنَكُمْ، وَلَا يَفْتِنُوْنَكُمْ.

সাহাবী আবূ হুরাইরাহ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “শেষ যুগে কতক মিথ্যুক দাজ্জালের [৬১] আগমন ঘটবে, যারা তোমাদের কাছে এমন এমন হাদীস নিয়ে আসবে যা তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরাও কখনো শুনেনি।”অতএব, তোমরা তাদের ব্যাপারে সাবধান হয়ে যাও, তারা যেন তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে না পারে এবং ফিতনা-ফাসাদে নিক্ষিপ্ত করতে না পারে।”[৬২]

অর্থাৎ- মিথ্যা ও জাল-বানোয়াট হাদীসের মাধ্যমে তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে। এ হাদীস প্রমাণ করে যে, কতক মিথ্যুক অসৎ ব্যক্তি নিজেদের তৈরি করা মিথ্যা ও জাল হাদীস মুসলিম সমাজে প্রচারের মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাবে। এটা অবশ্যই ঘটবে। কারণ এটা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ভবিষ্যতবাণী; কোন কাল্পনিক কথা নয়। এমতাবস্থায় মুসলিম সমাজ যদি যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই হাদীস গ্রহণ করে, তবে অবশ্যই বিভ্রান্তি ও ফিৎনার শিকার হবে।

অতএব, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নির্দেশ ও হুঁশিয়ারীর আলোকে হাদীসশাস্ত্রে ‘ইলমুর রিজালের প্রয়োগ একান্ত প্রয়োজন। এমনকি এ শাস্ত্রের কোন বিকল্প নেই বললেও ত্রুটি হবে না।

(গ) সাহাবীদের বক্তব্যের আলোকে ‘ইলমুর রিজাল: সাহাবীদের যুগে ‘ইলমুর রিজালের কোন প্রয়োজন অনুভব না হলেও তাঁদের পরবর্তী যুগে এটা অতিব জরুরী বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়। ফলে তাঁরা (সাহাবীগণ) সতর্কতামূলক ‘ইলমুর রিজালের সূচনা করেন, যেমন- আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) ও ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) হাদীস গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।[৬৩] বিশেষ করে সাহাবীদের যুগের শেষের দিকে ‘ইলমুর রিজালকে খুবই গুরুত্ব প্রদান করা হয়।

ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লা-হ) স্বীয় সনদে বর্ণনা করেন:

عَنْ مُجَاهِدٍ، قَالَ : جَاءَ بُشَيْرٌ الْعَدَوِيُّ إِلَى ابْنِ عَبَّاسٍ، فَجَعَلَ يُحَدِّثُ، وَيَقُوْلُ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ، قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ، فَجَعَلَ ابْنُ عَبَّاسٍ لَا يَأْذَنُ لِحَدِيْثِهِ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِ، فَقَالَ : يَا ابْنَ عَبَّاسٍ، مَالِىْ لَا أَرَاكَ تَسْمَعُ لِحَدِيثِىْ، أُحَدِّثُكَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ، وَلَا تَسْمَعُ، فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ : “إِنَّا كُنَّا مَرَّةً إِذَا سَمِعْنَا رَجُلًا يَقُوْلُ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ، ابْتَدَرَتْهُ أَبْصَارُنَا، وَأَصْغَيْنَا إِلَيْهِ بِآذَانِنَا، فَلَمَّا رَكِبَ النَّاسُ الصَّعْبَ، وَالذَّلُوْلَ، لَمْ نَأْخُذْ مِنَ النَّاسِ إِلَّا مَا نَعْرِفُ”.

“প্রসিদ্ধ তাবে’ঈ মুজাহিদ হতে বর্ণিত। একদা বাশীর ইবনু কা’ব আল আদাবী সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর কাছে আসলেন এবং হাদীস বর্ণনা শুরু করলেন, বলতে লাগলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন ইত্যাদি। কিন্তু সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) তাকে হাদীস বর্ণনার কোন সুযোগ দিলেন না। এমনকি তার দিকে দৃষ্টিপাতও করলেন না। বাশীর ইবনু কা’ব বললেন: হে ইবনু ‘আব্বাস! কি ব্যাপার! আপনি আমার হাদীস শুনছেন না কেন? আমি আপনাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হতে হাদীস বর্ণনা করছি, আর আপনি কর্ণপাত করছেন না? জবাবে ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন, প্রথম প্রথম কোন ব্যক্তিকে যখনই বলতে শুনতাম যে, “রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, সাথে সাথে তার কথায় আমরা মনোযোগী হতাম এবং খুব গুরুত্ব দিয়ে তার কথা শুনতাম, কিন্তু মানুষ যখন বিভিন্ন ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়া শুরু করল, তখন থেকে আমাদের জানা বিষয় ছাড়া সাধারণ মানুষ হতে অন্য কিছু শুনি না এবং গ্রহণও করি না।”[৬৪]

অতএব বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সাহাবীগণ হাদীস গ্রহণে শুধু ‘ইলমুর রিজালের সূচনাই করেননি, বরং কঠোর নীতি অবলম্বন করেছেন। সাহাবীদের যুগেই যদি এরূপ হয় তাহলে আমাদের যুগে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম হওয়াই স্বাভাবিক।

(ঘ) তাবি‘ঈদের বক্তব্যের আলোকে ‘ইলমুর রিজাল: সাহাবীদের যুগ শেষ হওয়ার পর হাদীসকে কেন্দ্র করে বিদআতীদের অপতৎপরতা আরো বৃদ্ধি পেল। ফলে তাবে’ঈগণ-এর নিকট ‘ইলমুর রিজালের বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্ব পেল। প্রসিদ্ধ তাবেঈ মুহাম্মদ বিন সীরীন (রাহিমাহুল্লা-হ) (মৃত্যু- ১১০হিজরী) বলেন:

“لَمْ يَكُوْنُوْا يَسْأَلُوْنَ عَنِ الْإِسْنَادِ، فَلَمَّا وَقَعَتِ الْفِتْنَةُ، قَالُوْا : سَمُّوْا لَنَا رِجَالَكُمْ، فَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ السُّنَّةِ فَيُؤْخَذُ حَدِيْثُهُمْ، وَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ الْبِدَعِ فَلَا يُؤْخَذُ حَدِيْثُهُمْ”.

“হাদীসের সনদ বা বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে (খুব বেশী) জিজ্ঞাসাবাদ করা হত না, কিন্তু যখন (কাদেরীয়া, মুরজিয়াহ্, জাবরিয়া ও রাফিযীয়া ইত্যাদি বিদআতের) ফিতনা প্রকাশ পেল, তখন হাদীস বর্ণনাকারীকে বলা হত তোমাদের যারা হাদীস বর্ণনা করেছে তাদের নাম উল্লেখ করো। অতঃপর লক্ষ্য করা হয়- যদি সুন্নাহপন্থী হয় তাহলে তাদের হাদীস গ্রহণ করা হত, আর যদি বিদআতী হয়, তাহলে তাদের হাদীস বর্জন করা হত। [৬৫]

তিনি আরো বলেন:

 إِنَّ هَذَا الْعِلْمَ دِيْنٌ، فَانْظُرُوْا عَمَّنْ تَأْخُذُوْنَ دِيْنَكُمْ .

“নিশ্চয় এটা অর্থাৎ- রিজাল শাস্ত্রের জ্ঞান দীনের অন্যতম অংশ; অতএব, ভালভাবে লক্ষ্য করো, তোমরা কাদের থেকে তোমাদের দীন গ্রহণ করছ। [৬৬]

সুলাইমান ইবনু মূসা বলেন, আমি তাবে’ঈ ত্বাউস (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সাক্ষাত পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, উমুক ব্যক্তি আমাকে এরূপ এরূপ হাদীস বর্ণনা করছেন, তিনি উত্তরে বললেন, যদি সে ন্যায়-নিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হয় তাহলে তার হাদীস গ্রহণ করো, (আর না হলে গ্রহণ করো না)। [৬৭]

প্রসিদ্ধ তাবে’ঈদের এরূপ সতর্কবাণী ও নির্দেশনায় প্রমাণিত হয় যে, হাদীসশাস্ত্রে ‘ইলমুর রিজালের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

(ঙ) মুহাদ্দিসগণের বক্তব্যের আলোকে ‘ইলমুর রিজাল: আল্লাহ তা’আলা আল কুরআনুল কারীমকে প্রত্যক্ষভাবে সংরক্ষণ করেন, আর হাদীসকে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে মুহাদ্দিসগণের ‘ইলমুল ইসনাদ বা ‘ইলমুর রিজালের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছেন, যেমন- মুহাদ্দিস ‘আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক (রাহিমাহুল্লা-হ) (মৃত্যু- ১৮১ হিজরী) বলেন:

 الْإِسْنَادُ مِنَ الدِّيْنِ، وَلَوْلَا الْإِسْنَادُ لَقَالَ مَنْ شَاءَ مَا شَاءَ .

“হাদীসের সনদ-সূত্র দীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ যদি এরূপ বর্ণনার ব্যবস্থা না থাকত তাহলে যার যা ইচ্ছা (হাদীসের নামে) তাই বলত।”[৬৮]

সনদ অর্থই ‘ইলমুর রিজাল; ‘ইলমুর রিজালের বাছ-বিচার থাকলে যার যা ইচ্ছা তা বলতে পারে না, অথবা বলে ফেললেও তা গ্রহণযোগ্য হয় না। মুহাদ্দিস ইমাম সুফইয়ান সাওরী (রাহিমাহুল্লা-হ) (মৃত্যু- ১৬১ হিজরী) বলেন:

الإسناد سلاح المؤمن إذالم يكن معه سلاح فبأى شيئ يقاتل؟

“ইসনাদ বা ‘ইলমুর রিজাল  হলো মুমিনের অস্ত্র, যদি তার অস্ত্রই না থাকে তাহলে সে কি দ্বারা লড়াই করবে।”[৬৯]

অর্থাৎ- ‘ইলমুর রিজাল বিহীন ব্যক্তি অস্ত্রহীন যোদ্ধার ন্যায়। অস্ত্রহীন যোদ্ধা যেমন প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, আত্মরক্ষাই করতে পারে না, তেমনি ‘ইলমুর রিজাল ছাড়া নিজের ঈমান-ইসলামকেও ঠিক রাখা কঠিন। কারণ, এ বিদ্যা ব্যতিরেকে হাদীসের বিশুদ্ধতা অর্থাৎ- সহীহ-যঈফ-এর পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব নয়। ফলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নামে বানোয়াট জাল হাদীসের ধোকায় পড়ে ঈমান-‘আমল নষ্ট ও সবই নিস্ফল হয়ে যাবে। তাই হাদীসশাস্ত্রে ‘ইলমুর রিজালের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

এমনিভাবে মুহাদ্দিসগণ ‘ইলমুর রিজালকে শুধু স্মৃতির পাতায় নয়, বরং কাগজের পাতায় সংকলন করে তার প্রসার ঘটিয়েছেন; যারা এ বিষয়ে সংকলন ও সংগ্রামে চিরস্মরণীয়- তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইমাম শাফি‘ঈ (মৃত্যু- ২০৪ হি:), ইমাম আহমাদ (মৃত্যু- ২৪১ হি:), ইমাম দারেমী (মৃত্যু- ২৫৫ হি:), ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইসমা-ঈল বুখারী (মৃত্যু- ২৫৬ হি:), ইমাম মুসলিম (মৃত্যু- ২৬১ হি:), ইমাম আবূ যুর’আহ রাযী (মৃত্যু- ৩৬৪ হিজরী), ইমাম ইবনু হিব্বান (মৃত্যু- ৩৫৪ হিজরী), ইমাম হাফিয আল মিয্যী (মৃত্যু- ৭৪২ হিজরী), ইমাম হাফিয শামসুদ্দিন আয্যাহাবী (মৃত্যু- ৭৪৮ হিজরী), ও ইমাম হাফিয ইবনু হাজার আল ‘আসকালানী (মৃত্যু- ৮৫২ হিজরী), প্রমুখ রিজালবিদগণ (রাহিমাহুল্লা-হ)।

উপসংহার: পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, হাদীস ইসলামী শরীয়ার দ্বিতীয় উৎস। হাদীস ছাড়া শুধু কুরআন দিয়ে ইসলাম পালন সম্ভব নয়। অবশ্যই কুরআনের পাশে হাদীসকে রেখে উভয়ের মাধ্যমে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু সাহাবীদের যুগের শেষলগ্নে ইসলাম বিরোধী অপশক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নামে প্রসিদ্ধ সাহাবীদের বরাতে মনগড়া, মিথ্যা ও জাল হাদীস রচনা করে হাদীসশাস্ত্রকে কলুষিত করার অপচেষ্টা চালায়। অপরপক্ষে আল্লাহ তা‘আলার অসীম অনুগ্রহে এ চক্রান্তকে ব্যর্থ করতে শুরু হয় হাদীস বর্ণনাকারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের সততা ও নির্ভরযোগ্যতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এর নামই হলো ‘ইলমুল ইসনাদ বা ‘ইলমুর রিজাল, যার সূচনা হয় সাহাবীদের যুগে। অতঃপর পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনের তাগিদে এ জ্ঞান-গবেষণার বিস্তার লাভ ঘটে। হাদীসশাস্ত্রে ‘ইলমুর রিজালের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা কুরআন, হাদীস, সাহাবী, তাবে’ঈ ও মুহাদ্দিসগণের বক্তব্যের আলোকে অতি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করা হয়েছে। যাতে প্রমাণিত হয় লবন ছাড়া যেমন খাদ্য অপরিপূর্ণ ও অনুপযুক্ত; তেমনি ‘ইলমুর রিজাল ছাড়া হাদীস অপরিপূর্ণ ও আমলের অনুপযুক্ত। সুতরাং হাদীসশাস্ত্রকে কলুষমুক্ত রাখতে ‘ইলর্মু রিজালের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। হাদীসকে গ্রহণযোগ্য করতে এর কোন বিকল্প নেই। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের বিশুদ্ধ হাদীস গ্রহণের লক্ষ্যে এ জ্ঞান গবেষণায় আরো অগ্রসর হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন আমীন।

 

টীকা:

[৩৮] সূরা আল বাক্বারাহ্ ২:১৮৫।

[৩৯] সূরা আন্ নাহ্ল ১৬:৪৪।

[৪০] ইমাম আবূ দাঊদ, সুনান আবূ দাঊদ, ‘আউনুল মা‘বূদসহ, দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ্, বইরূত, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৮ ইং, পৃ: ১২/২৩১, হা: ৪৫৯১, ৪৬০৪।

[৪১] সূরা আল হাশর ৫৯:৭।

[৪২] সূরা আন্ নাজম ৫৩: ৩, ৪।

[৪৩] বুখারী- কিতাবুল ইতিসাম, ফাতহুল বারীসহ, দারুস সালাম রিয়াদ, ১ম সংস্করণ- ১৯৯৭, পৃ: ১৩/৩০৬, হা: ৭২৮০।

[৪৪] সূরা আল হিজর ১৫:৯।

[৪৫] ড. মাহমুদ তাহহান, তাইসীর মুসতলাহিল হাদীস, মাক্তাবাতুল মাআরিফ, রিয়াদ, ৯ম প্রকাশ, ১৯৯৬ ইং, পৃ: ৯-১০।

[৪৬] মুহাম্মদ বিন সালিহ আল ‘উসাইমীন, শারহুল মান্যুমাহ আল বাইকূনিয়্যাহ, দারুসসারায়া, রিয়াদ, প্রথম প্রকাশ-২০০২ ইং, পৃ: ১২।

[৪৭] ড. মাহমুদ তাহ্হান, তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস, প্রাগুক্ত, পৃ: ১৬।

[৪৮] ড. মুহাম্মদ বিন মাতার আয্যাহরানী,্রعلم الرجال نشأته وتطورهগ্ধ দারূল হিজ্রা, রিয়াদ, ১ম প্রকাশ- ১৯৯৬ ইং, পৃ: ১৫, ১৬। অবশ্যالاسناد  ওالسند  উভয়ের সংজ্ঞায় কারো কারো নিকট কিছুটা পার্থক্য থাকলেও অধিকাংশের নিকট শব্দ দু’টি একই অর্থেও ব্যবহার হয়। তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস প্রাগুক্ত, পৃ: ১৬, ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী- ্রنزهة النظرগ্ধ  প্রকাশনা বিহীন, প্রকাশ কাল- ১৪০৬ হিজরী, পৃ: ৫২, ৫৩।

[৪৯] মুসলিম,كتاب الادب  দারুল মা‘রিফাহ, বইরূত, ৫ম প্রকাশ, ১৯৯৮ ইং, পৃ: ১৪/৩৫৭, হা: ৫৫৯৩, মূল হাদীসটি সহীহুল বুখারীতেও এসেছে, كتاب الاستأذان প্রাগুক্ত, হা: ৬২৪৫।

[৫০] ইমাম নাববী,المنهاج شرح صحيح مسلم بن الحجاج   দারুল মা‘রিফাহ, বইরূত, পঞ্চম প্রকাশ, ১৯৯৮ ইং পৃ: ১৪/ ৩৫৭।

[৫১] ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু ‘আন্হু) সম্পর্কে সহীহুল বুখারী-সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত ঘটনাটি আমরা উল্লেখ করেছি। আর আবূ বক্র (রাযিয়াল্লাহু ‘আন্হু) সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা অর্থাৎ- দাদীকে মীরাসি অংশ প্রদানের ঘটনা জনসম্মুখে বহুল পরিচিত সেটির দিকেই ইমাম ইবনু হিব্বান ইংগিত করেছেন। মূলতঃ এ ঘটনাটি বিশের অধিক সূত্রে প্রমাণিত, কিন্তু সকল সূত্রই ত্রুটিযুক্ত, বি: দ্র: ড: মুহাম্মদ যাহরানী- ‘ইলমুর রিজাল প্রাগুক্ত, পৃ: ২২, টীকা নং- ০১, এজন্য আমরা এ ঘটনাটি প্রবন্ধে উপস্থাপন করিনি।

[৫২] ইমাম ইবনু হিব্বান তাহ্কীক মাহ্মূদ ইব্রা-হীম যায়িদ দরুল ওয়াঈ, হালব, প্রকাশকাল বিহীন। পৃ ০১/৩৮।

[৫৩] সূরা আল হুজরাত ৪৯ : ০৬।

[৫৪] দ্র: মুকাদ্দামাহ্ সহীহ মুসলিম, ইমাম নববীর শরাহ সহ, দারুল মারিফাহ, বাইরূত, পঞ্চম প্রকাশ, ১৯৯৮ ইং, পৃ: ১/২১।

[৫৫] ইবনু কাসীর তাফসীরুল কুরআনিল আযীম- দারুস্ সালাম, রিয়াদ, ১ম প্রকাশ- ১৯৯২ ইং, পৃ: ৪/২২০।  ইমাম মুহাম্মদ বিন আহমাদ আল-কুরতুবী-আলজামি লি আহকামিল কুরআন- দারুল কিতাব আল আরাবী, বইরূত। ৪র্থ প্রকাশ- ২০০১ ইং, ১৬/২৬৫।

[৫৬] ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম- নাববীর শরাহ্-সহ, দারুল মারিফাহ্, বইরূত, পঞ্চম প্রকাশ- ১৯৯৮ ইং, পৃ: ১/২৭, হা: ৪, ৩/৩।

[৫৭] ইমাম নাবাভী المنهاج شرح صحيح مسلم بن الحجاج প্রাগুক্ত, পৃ: ১/৩০।

[৫৮] ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম- প্রাগুক্ত, পৃ: ১/২৬, সহীহুল বুখারী- প্রাগুক্ত, পৃ: ১/২৬৬, হা: ১০৮।

[৫৯] ইমাম বুখারী, সহীহুল বুখারী- প্রগুক্ত, পৃ: ১/২৬৫, হা: ১০৭।

[৬০] ইমাম মুসলিম, মুকাদ্দামাহ্ সহীহ মুসলিম, প্রগুক্ত, পৃ: ১/৩২। হা: ৭।

[৬১] দাজ্জাল শব্দের অর্থ মিথ্যুক, আচ্ছন্নকারী, বিভ্রান্তকারী ইত্যাদি। দ্র: ইউসুফ বিন ‘আবদুল্লাহ আল ওয়াবেল, আশরাতুস সাআহ, দারু ইবনুল জাওযী, দাম্মাম, প্রকাশ- ১৮ তম, ১৪২৪ হিজরী, পৃ: ২৭৫-২৭৭।

[৬২] মুকাদ্দামাহ্ সহীহ মুসলিম- প্রাগুক্ত, পৃ: ১/৩৭, হা: ৭/৭, ১৬।

[৬৩] এ প্রবন্ধের “ইল্মুর রিজালের সূচনা” শিরনামে তাঁদের অবস্থান আলোকপাত করা হয়েছে।

[৬৪] মুকাদ্দামাহ্ সহীহ মুসলিম- প্রাগুক্ত, পৃ: ১/৩৯, আসার নং- ২১।

[৬৫] মুকাদ্দামাহ্ সহীহ মুসলিম- প্রাগুক্ত, পৃ: ১/৪৪, আ: নং- ২৭।

[৬৬] মুকাদ্দামাহ্ সহীহ মুসলিম- প্রাগুক্ত, পৃ: ১/৪৪, আ: নং- ২৬।

[৬৭] মুকাদ্দামাহ সহীহ মুসলিম- প্রাগুক্ত, পৃ: ১/৪৪, আ: নং- ২৮।

[৬৮] মুকাদ্দামাহ সহীহ মুসলিম- প্রাগুক্ত, পৃ: ১/৪৭, আ: নং ৩২।

[৬৯] ইমাম ইবনু হিব্বান, মুকাদ্দামাতু আল মাজরুহীন, তাহ্: মাহমূদ ইব্রা-হীম, দারুল ওয়াঈ, হালব, প্রকাশকাল বিহীন, পৃ: ১/২৭।

Share With
Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
সর্বশেষ পোস্ট
মাননীয় ধর্ম উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন হাফিযাহুল্লাহ-এর বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং মাদরাসা মুহাম্মাদীয়া আরাবীয়া পরিদর্শন ও সংবর্ধনা সভা-২০২৪ গতকাল সফলভাবে সুসম্পন্ন হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।
Special Web Offer
Do you want to Create your Own or Business's Digital Appearance